পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে আবহাওয়ার বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিল ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)। আগামী কয়েকদিন রাজ্যের উত্তর ও দক্ষিণ অংশে সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ও ডুয়ার্স অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গে বজ্রঝড়, বিদ্যুৎ চমকানো ও অস্বস্তিকর গরম পরিস্থিতি বজায় থাকবে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগর থেকে প্রবল আর্দ্রতা উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে প্রবেশ করায় সাব-হিমালয় অঞ্চলে একটি শক্তিশালী বৃষ্টির সিস্টেম সক্রিয় হয়েছে। এর জেরেই দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলায় ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা দ্রুত বাড়ছে।
উত্তরবঙ্গে অরেঞ্জ অ্যালার্ট
IMD ইতিমধ্যেই উত্তরবঙ্গের একাধিক জেলায় অরেঞ্জ অ্যালার্ট জারি করেছে। বিশেষ করে ২৩ ও ২৪ মে পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর হতে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে।
২১–২২ মে: বৃষ্টি ধীরে ধীরে বাড়বে
আগামী ২১ ও ২২ মে থেকে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি শুরু হবে। সঙ্গে বজ্রঝড় ও দমকা হাওয়াও থাকতে পারে। কিছু এলাকায় ৭–১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
যেসব জেলায় বেশি প্রভাব পড়তে পারে:
- দার্জিলিং
- কালিম্পং
- জলপাইগুড়ি
- আলিপুরদুয়ার
- কোচবিহার
- উত্তর দিনাজপুরের কিছু অংশ
২৩–২৪ মে: সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৩ ও ২৪ মে উত্তরবঙ্গে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। কিছু এলাকায় ৭–২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি রেকর্ড হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায় লাগাতার বৃষ্টির ফলে মাটি আলগা হয়ে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়বে। ডুয়ার্স ও সমতল এলাকায় নদীর জলস্তর বাড়তে পারে।
দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে ধসের বড় আশঙ্কা
IMD স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলার পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি রাস্তা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সম্ভাব্য বিপদ:
- পাহাড়ি রাস্তায় ধস
- গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া
- পর্যটকদের আটকে পড়ার সম্ভাবনা
- ছোট নদী ও ঝর্নায় হঠাৎ জল বৃদ্ধি
- চা বাগান এলাকায় জল জমা
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টানা কয়েকদিন ভারী বৃষ্টি হলে NH-10 সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি রাস্তায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
শিলিগুড়ি ও ডুয়ার্স এলাকায় জল জমার আশঙ্কা
শিলিগুড়ি, মালবাজার, ময়নাগুড়ি, ফালাকাটা ও আলিপুরদুয়ার শহরের নিম্নাঞ্চলে দ্রুত জল জমতে পারে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে শহরের রাস্তায় জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে।
সম্ভাব্য প্রভাব:
- যানজট
- বাজার এলাকায় জল ঢোকা
- বিদ্যুৎ পরিষেবায় সমস্যা
- ট্রেন চলাচলে বিলম্ব
দক্ষিণবঙ্গে বজ্রঝড় ও অস্বস্তিকর গরম
উত্তরবঙ্গে বৃষ্টি বাড়লেও দক্ষিণবঙ্গে গরম ও আর্দ্রতা আরও বাড়তে পারে। কলকাতা সহ দক্ষিণের বেশিরভাগ জেলায় ভ্যাপসা গরম পরিস্থিতি বজায় থাকবে।
বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে কালবৈশাখীর মতো বজ্রঝড় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সঙ্গে বজ্রপাত ও ঘণ্টায় ৪০–৫০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়া বইতে পারে।
যেসব জেলায় বজ্রঝড়ের সম্ভাবনা বেশি:
- বীরভূম
- মুর্শিদাবাদ
- নদিয়া
- পূর্ব বর্ধমান
- পশ্চিম বর্ধমান
- পুরুলিয়া
- হাওড়ার কিছু অংশ
কলকাতার আবহাওয়া কেমন থাকবে?
কলকাতায় আগামী কয়েকদিন দিনের তাপমাত্রা ৩৪–৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা অনেক বেশি হতে পারে।
কলকাতার সম্ভাব্য পরিস্থিতি:
- প্রবল আর্দ্রতা
- বিকেলের দিকে কালো মেঘ
- বজ্রবিদ্যুৎসহ স্বল্প সময়ের বৃষ্টি
- সন্ধ্যায় দমকা হাওয়া
- রাতেও অস্বস্তিকর গরম
অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ চমকানোর সম্ভাবনা থাকায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
পর্যটকদের জন্য বিশেষ সতর্কতা
বর্তমানে দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ে পর্যটকদের ভিড় থাকায় প্রশাসন অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করেছে। পাহাড়ে ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার আপডেট দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পর্যটকদের কী মাথায় রাখতে হবে:
- পাহাড়ি এলাকায় রাতের যাত্রা এড়িয়ে চলুন
- অতিরিক্ত বৃষ্টির সময় হোটেলের বাইরে কম বেরোন
- প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন
- জরুরি নম্বর হাতের কাছে রাখুন
- পাহাড়ি নদীর ধারে না যাওয়াই ভালো
IMD-এর নিরাপত্তা পরামর্শ
আবহাওয়া দফতর সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে।
কী করবেন:
- বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় না দাঁড়ানো
- গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া
- মোবাইল চার্জে লাগিয়ে ব্যবহার না করা
- পাহাড়ি এলাকায় অপ্রয়োজনীয় যাত্রা বন্ধ রাখা
- বাড়িতে শুকনো খাবার ও জরুরি ওষুধ মজুত রাখা
উপসংহার
মে মাসের শেষ সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়া অত্যন্ত অস্থির হতে চলেছে। উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টি ও ধসের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনই দক্ষিণবঙ্গে বজ্রঝড় ও ভ্যাপসা গরম সাধারণ মানুষের সমস্যা বাড়াতে পারে।
বিশেষ করে দার্জিলিং, কালিম্পং ও ডুয়ার্স অঞ্চলের বাসিন্দাদের আগামী কয়েকদিন অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে, তাই নিয়মিত IMD ও প্রশাসনের আপডেট নজরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
